

কক্সবাজারের টেকনাফে নতুনভাবে কয়েকটি ইউনিয়ন করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানাগেছে। নাগরিক সেবা ত্বরান্বিত করতে উপজেলার বর্তমান ইউনিয়ন সমুহ ভেঙ্গে পৃথক পৃথক আরো কয়েকটি ইউনিয়ন করা হচ্ছে বলে লোকেমুখে শুনা যাচ্ছে। নতুন করে ইউনিয়ন সৃষ্টির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে একটি সুত্র জানিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, নতুন করে ইউনিয়ন বিভক্ত হলে নাগরিক সেবা গ্রহণে নানান ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হবে মর্মে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, তড়িঘড়ি করে ইউনিয়ন বিভক্তি হলে গ্রামে গ্রামে নেতৃত্বের দ্বন্ধ সৃষ্টি হবে। হানাহানি ও জনমানুষের ভোগান্তি বাড়বে বলে মনে করেন। সুত্র জানায়, ইউনিয়ন বিভক্তির সাথে সাথে প্রত্যেক নাগরিকের ঠিকানাও পরিবর্তন হবে। এতে সাধারণ মানুষের নাগরিক সেবা গ্রহণে কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। যাবতীয় ডকুমেন্ট ওলট-পালট হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণ নতুনকরে সমস্যা পড়তে পারে। নাগরিক সেবা গ্রহণের যাবতীয় কিছু পুনরায় তৈরী করতে প্রতিটি লোকজনকে নতুন করে অর্থনৈতিক ক্ষতি গুণতে হবে। সত্যি সত্যি ইউনিয়ন পৃথক করতে হলে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই এলাকা ভিত্তিক গণশুনানীর মাধ্যমে করার দাবী জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। ইউনিয়ন পৃথকীকরণে সীমান্ত নির্ধারণের বিষয়টি কিছুটা জটিল এবং কঠিন। ইউনিয়ন পরিষদের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র বিভক্তি করণে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিক ও সমাজকর্মীরা। ধুমধাম ইউনিয়নকে বিভক্ত না করে নাগরিক সেবা পরিষেবা আরো সহজতর করার দাবী জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরদিকে নির্বাচন কমিশন (১৫ জুলাই) গেল বুধবার স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্টানের লক্ষ্যে আগামী মাসের ২৭ তারিখের ভোট কেন্দ্রের চুড়ান্ত তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এতেই স্পষ্ট যে, আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় নির্বাচনের তপশীল ঘোষণা হতে পারে। এই সময়ে তড়িঘড়ি করে ইউনিয়ন বিভাজন হলে নানান ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে জানিয়ে স্থানীয়দের বেশীর ভাগই ইউনিয়ন বিভক্তি না করার দাবী জানিয়েছেন।
উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড দরগাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় দোকানদার হামিদ হোসাইন ইউনিয়ন বিভক্তিতে চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড ভাগ হলে সাধারণ মানুষের নাগরিক সুবিধা পেতে কষ্ট পাবে। ইউনিয়ন পৃথকীকরণে গরীব এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়ে যাবে। ঠিকানা ওলট পালটে নাগরিক সেবা পরিষেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষের কষ্টের শেষ সীমা থাকবেনা জানিয়ে তিনি ইউনিয়ন বিভক্তিতে নিজেদের বিরোধীতার কথা জানান। ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও এনজিও কর্মী আব্দুল আমিন জানান, ইউনিয়ন বিভক্ত হলে নাগরিক সুবিধা এলোমেলা হয়ে যাবে। গ্রামে গঞ্জে নেতৃত্ব নিয়ে গ্রুপিং সৃষ্টি হবে। ৯জন মেম্বারের পরিবর্তে ১৮জন মেম্বার হতে গিয়েই এক ধরণের হানাহানি ও মারামারি হতে পারে জানিয়ে এই এনজিও কর্মী ইউনিয়ন বিভক্তির বিষয়ে চরম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। একই ওয়ার্ডের নাগরিক স্থানীয় মসজিদের খতীব মাওলানা আবুল হাশেম জানান, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্থ। তার মাঝেই ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিভক্তিতে এলাকায় এলাকায় সংঘাত এবং বিশৃংখলা হতে পারে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেছেন। ইউনিয়ন বিভক্তিতে বিবেদ এবং দ্বন্ধ বাড়বে জানিয়ে তিনি ইউনিয়ন যেভাবে আছে সেভাবে থাকলে ভাল হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেন। ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সচেতন নাগরিক ও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাষ্টার নজির আহমদ জানান, ইউনিয়ন বিভক্তিকে তিনি এক ধরণের হঠকারি সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। এই মুহুর্তে ইউনিয়ন বিভক্তি, নাগরিক সুবিধা পেতে জনসাধরণের কষ্ট পোহাতে হবে। পাশাপাশি জনভোগান্তিও বাড়তে পারে বলে সচেতন এই নাগরিক মনে করছেন। গণশুনানী ও গণরায়কে অগ্রাহ্য করে তাড়াহুড়ায় যদি এমন হয়ে থাকে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হানাহানি মারামারির মত ঘটনা ঘটতে পারে জানিয়ে আপাততদৃষ্টিতে ইউনিয়ন বিভক্ত না হলে ভাল হবে তিনি মত দিয়েছেন। নাটমুরাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় সচেতন অভিভাবক মীর কাশেম জানান, ইউনিয়ন ভাগ হলে লোকজনের মধ্যে টানাটানি ও মারামারি হবে। লোকজনের মধ্যে কষ্ট বাড়বে। পাশাপাশি নাগরিকদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে জানিয়ে তিনি ইউনিয়ন বর্তমানে যেভাবে আছে; সেভাবেই থাকলেই ভাল হবে বলে মনে করেন। উম্মে সালমা বালিকা দাখিল মাদরাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা এনামুল হক মনজুর জানান, তাড়াহুড়া করে ইউনিয়ন বিভক্তি হলে জনমানুষের ভোগান্তি বাড়বে। নাগরিক সনদ ও জন্মনিবন্ধনসহ যাবতীয় কিছু পরিবর্তনে নাগরিক সুবিধা গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হবে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে যাচ্ছেন জানিয়ে তিনি জনসাধারণের স্বার্থে সময় নিয়ে আগামী নির্বাচনের পরে ইউনিয়ন পৃথকীকরণের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ইউনিয়ন বিভক্তিতে সম্পুর্ণ দ্বি-মত পোষণ করে সমাজকর্মী ও রাজনীতিক সায়েম সিকদার বলেন, নাগরিক সেবা বা পরিষেবা আরো সহজতর না করে ইউনিয়নকে দুই ভাগে ভাগ করে যারা হ্নীলার মানুষের ভোগান্তি বাড়াতে চাচ্ছেন তাদেরকে বিভক্তির প্লান থেকে সরে আসার আহবান জানিয়েছেন। ইউনিয়নকে ভাগ করলে কিছু কিছু সুবিধাবাদী মানুষ ইয়াবার টাকা খরচ করে মেম্বার-চেয়ারম্যান হবে এটা নিয়ে তারা হয়তোবা কাজ করছেন জানিয়ে তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকেও ইউনিয়ন বিভক্তি থেকে সরে আসার আহবান জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাষ্টার মো: আব্দুস সালাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিয়ন ভাগ হলে নাগরিক মর্যদা কমে যাবে। এছাড়া সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে এলাকায় এলাকায় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দ্বন্ধ তৈরী হবে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড ভাগাভাগি করলে নাগরিক সেবায় বিভ্রান্তি বিভ্রাট ও দুর্দশা সৃষ্টি হবে। টেকনাফের ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন হিসেবে যে মর্যদা ইজ্জত ও স্বকীয়তা আছে তা বিনষ্ট হবে জানিয়ে তিনি ঐতিহ্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলকে হ্নীলা ইউনিয়নকে বিভক্তি না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
টেকনাফে সাংবাদিক সমিতির (টেসাসের) আহবায়ক মমতাজুল ইসলাম মনু জানান, ইউনিয়ন বিভক্তি দলীয় বা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য হচ্ছে কিনা অথবা ব্যক্তি বা কোন গোষ্ঠী নির্বাচনের ফল নিজেদের অনুকূলে আনতে এমনটি করবে কিনা সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এড. মনিরুল ইসলাম মনে করেন, এই মুহুর্তে ইউনিয়ন বিভাজনে জনগণ তেমন সুফল পাবেনা। বিভক্তি হলে জনগণের ভোগান্তি এবং হয়রানী বাড়বে। এছাড়া নেতৃত্বের দ্বন্ধে নুতন করে সমস্যা দেখা দিতে পারে জানিয়ে এই আইনজীবি নাগরিক সেবা আরো ত্বরান্বিত করতে ইউপি চেয়ারম্যান এবং সচিবদের পরিষদমুখী করার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্থানীয় সচেতন মহলসহ প্রায় সর্বস্তরের মানুষ মনে করেন, তড়িঘড়ি করে রাতারাতি ইউনিয়ন পরিষদ বিভক্তিতে জনসাধারণের দু:খ দুর্দশা বাড়বে। স্থানীয় রাজনীতির দোহাই দিয়ে অসুস্থ ও নোংরা রাজনীতির প্রতিযোগীতা বৃদ্ধি পাবে। নাগরিক সুবিধা আরো বেশী সহজতর করতে জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিষদমুখী করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।##


পাঠকের মতামত